কাজী নজরুল ইসলাম এবং বিশ্বসংগীত

0
1300

যাপিত জীবন-অভিজ্ঞতার টুকরো সাজিয়েই শিল্পী তাঁর নির্মাণের জগত সাজিয়ে তোলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে-’ আপন সৃজনশীল জগৎ সাজিয়েছিলেন নানা রঙে। নজরুলের জীবন-যাপনের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন মানুষ মাত্রেই জানেন নানান উত্থানপতনের মধ্য দিয়েই তাঁর জীবন। সৈনিকের জীবনের অভিজ্ঞতা, জেল খাটার অভিজ্ঞতা এসবই তাঁর গানের পরতে পরতে রয়েছে। বাংলা সঙ্গীতের জগত পাঁচজন গুণী শিল্পীর কলম এবং সুরের স্পর্শে সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত সেন এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। কবি হিসাবে নজরুলের জনপ্রিয়তা অনস্বীকার্য তবে আপামর বাঙালি তাঁকে ভালোবেসেছে গানের জন্যই।

চুরুলিয়ার গ্রাম্য পরিবেশে বড়ো হয়ে ওঠা কবির শৈশব ছিল সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক বিশ্বের সাথে পরিচিত হয়ে ওঠার সময়। এই শিক্ষাই তাঁকে পরবর্তী জীবনে বহু বিচিত্র বিষয়ে দু’হাতে গান লিখতে সাহায্য করেছে। বিদ্রোহী কবির উপাধি পাওয়া কবি একহাতে লিখেছেন বিদ্রোহের কবিতা । আবার সেই কবির কণ্ঠেই যখন আমরা শুনি ‘বিরহ ব্যথা নাহি কি সেথা? বাজে না বাঁশী নদীর তীরে…’ কিংবা ‘প্রিয় যাই যাই বলো না’ এমন উচ্চারণ তখন বিস্মিত হতে হয় বইকি! প্রকৃতপক্ষে নজরুলের বিদ্রোহ ছিল শোষণের বিরুদ্ধে, সামাজিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে। বর্তমান বিশ্ব-পরিস্থিতিতে তাই আজও তিনি সমান প্রাসঙ্গিক।
নজরুলের গানের ভুবন সাজানো আছে বিভিন্ন আঙ্গিকের গান দিয়ে। গান রচনাও করতেন অনাড়ম্বর ভঙ্গীমায়। একটি হারমোনিয়াম এবং পানের বাটা নিয়ে বসে পড়লেই হলো। এভাবেই তিনি রচনা করেছেন দেশবন্দনা, প্রকৃতি বন্দনা, গজল আঙ্গিকের গান, কাজরি গান, শ্যামাবন্দনা প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ের অজস্র গান। গানগুলির সুরের বৈচিত্র্য আলাদা করে উল্লেখের দাবি রাখে। সুরের ক্ষেত্রে বাংলার কাব্যগীতির ঢঙ যেমন তিনি ব্যবহার করেছেন তেমনই করেছেন পাশ্চাত্য সুরের ব্যবহারও। পাশ্চাত্য সুরকে আত্ত্বীকরণ করেছেন রবীন্দ্রনাথও তবে নজরুলের ক্ষেত্রে এই অনুসরণের ধরণ একেবারেই ভিন্ন।

মোরশেদ শফিউল হাসানের বক্তব্য থেকে জানা যায় নজরুলের কর্মপরিধির ব্যাপকতার কথা। তিনি কেবল নিজের গান নয়– সুর করেছেন অন্য গীতিকারদের জন্যও। প্রশিক্ষক হিসাবে গান শিখিয়েছেন বহু শিল্পীকে। প্রতিভা বসু তাঁর ‘জীবনের জলছবি’-তে নজরুলের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে গেছেন। এছাড়াও মঞ্চ এবং চলচ্চিত্রের সাথেও তিনি যুক্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাস অবলম্বনে গোরা চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল।

নজরুলের গানে আরব, তুরস্ক, পার্সী এবং দক্ষিণ ভারতীয় ধ্রুপদ সঙ্গীত ও ঠুংরী কাওয়ালী গজলের সাথে আছে বাংলার বাউল সুরের বিমিশ্রণ। কল্পনা, কথা, সুর ও কবিত্ব-শক্তির এমন সার্থক ব্যবহার ইতিপূর্বে তার পূর্বসুরিদের রচনায় পাওয়া যায়নি। বিশ্বসংগীতের প্রভাব ঠিক কেমনভাবে সমৃদ্ধ করেছিল দুখু মিঞার রচনাকে মিউজিয়ানার এই পর্বে সে বিষয়টি সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে দুই বাংলার দুই প্রবাদপ্রতীম শিল্পী খইরুল আনম সাকিল এবং শ্রীকান্ত আচার্যের কথোপকথনে। শিল্পী খইরুল আনম সাকিল সঙ্গীতের জগতে পরিচিতি পান নজরুলগীতি চর্চার মাধ্যমেই। শৈশব থেকে গান-বাজনার পরিবেশে বড় হয়েছেন, মা নীলুফার খৈয়াম ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী কিন্তু এসব সত্ত্বেও এই জগত সম্পর্কে একেবারেই আগ্রহ ছিল না তাঁর। মামা মাহমুদুর রহমান বেনোর প্রেরণা এবং উৎসাহেই সঙ্গীত জগতে শিল্পীর পদার্পণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here