ভবপ্রীতানন্দ ওঝার তিনশ বছর পুরাতন পদ নবরূপে।

0
1052

রেকর্ডিং স্টুডিয়ো ফ্লোরে হঠাৎ করেই দেখা হয়ে গেলো সেই মানুষটির সাথে যাঁর জন্য আজকের অন্যতম সফল একজন গায়িকা হিসাবে পরিচিতির গল্পটা শুরু হয়েছিল। ‘করিলাম বাসর সাজ’ গানটির মুক্তির প্রসঙ্গে ইমন চক্রবর্তী গুরু রাজকুমার রায় সম্পর্কে এমন কথাই বললেন। নরম একতাল মাটিকে যেমন ভাবে গড়ে পিঠে রূপ দেন শিল্পী তেমনই ঠিক যত্নে ইমনকেও সঙ্গীতের হাতেখড়ি দিয়েছিলেন তিনি। সেই স্মৃতি স্মরণ করেই গুরুর নতুন কাজে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন ইমন। শিল্পী রাজকুমার রায় শিষ্যের এই আগ্রহের মর্যাদা দেন এবং সংযুক্ত করে নেন এই সৃষ্টির সঙ্গে।

উত্তর এবং দক্ষিণ ভারতীয় দু’ধরণের লোকগানেই শিল্পী রাজকুমার রায় গবেষক এবং বিশেষজ্ঞ। বাংলা লোকসঙ্গীতের জন্য তিনি নিরলস কাজ করে চলেছেন, নিজ শহর শ্রীরামপুরে নতুন লোকসঙ্গীত শিল্পীদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য প্রতিবছর তিনি শিকড় উৎসবের আয়োজন করেন।   রাজ্য এবং ন্যাশনাল স্কলারশিপপ্রাপ্ত শিল্পী এভাবেই নিজের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সেই মানুষটির নতুন গান মুক্তি পেল ইউটিউবে গতকাল।

‘করিলাম বাসর সাজ’ গানটি আদি ঝুমুর পর্যায়ের একটি গান। পৃথিবীর আদিসংগীতের মুকুট এই ধরনের গানকেই দেওয়া হয়ে থাকে। ঝুমুরই পরবর্তীকালে বিবর্তিত হয়ে কখনো হয়েছে নাচনী, কখনো দরবারী ঝুমুর, কখনো বা কীর্তন অঙ্গের ঝুমুর। চৈতন্য পরবর্তী যুগে ঝুমুর গানে ভণিতা অর্থাৎ পদকর্তার উল্লেখ শুরু হয় যাদের মধ্যে একজন ভবপ্রীতানন্দ ওঝা। পদকর্তা সম্পর্কে ইতিহাসে বিশেষ কিছুই জানা যায় না। ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করা কিংবদন্তীর পরিচয় ধরা আছে তাঁর ২২৭ টি ঝুমুর গান সম্বলিত ‘রসমঞ্জরী’ গ্রন্থটিতে। পদকর্তা জীবিত আছেন ঐ বই-এর প্রতি পাতার অক্ষরে অক্ষরে। ‘করিলাম বাসর সাজ’- গানটি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আধারিত ঝুমুর যেটিকে শিল্পীরা দরবারী ঝুমুর বলে চিহ্নিত করেন।

নৃত্য, গীত ও বাদ্য সহযোগে ঝুমুর গাওয়া হলেও এতে গীতের প্রাধান্য থাকে। বৈঠকী ঝুমুরে গায়ক একজন, কোন নাচ থাকে না এবং বাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় হারমোনিয়াম এবং পাখোয়াজ। ভবপ্রীতানন্দের রচিত প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো এই পদটি শিল্পী রাজকুমার রায় যা নতুনভাবে প্রকাশ করলেও সাবেকি যন্ত্রানুসঙ্গ রক্ষা করেছেন বর্তমান যুগে বিরল। সঙ্গে ব্যবহার করেছেন দোতারা যেটি মূলধারায় ব্যবহৃত হতো না। দোতারার সার্থক ব্যবহারের ফলে গানটি আরও শ্রুতিমধুর হয়ে উঠেছে। ইমনের ভাষায় – “এভাবে গান তৈরি করতে এখন অনেকেই সাহস করবেন না, রাজকুমার দা বলেই পেরেছেন।”

গানটির দৃশ্যায়নও আলাদা উল্লেখের দাবী রাখে। পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় অঞ্চলের আলো-আঁধারি আখড়ার পরিবেশ ঐতিহ্যবাহী এই লোকগানে আলাদাই মাত্রা যোগ করেছে। “সরলপ্রাণা গ্রামবাসীদের সহযোগিতা এবং তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ছাড়া এই কাজ কখনোই সম্ভব ছিল না। আর সম্ভব ছিল না সুমন এবং সত্যজিতের কঠোর পরিশ্রম ছাড়া।” একথা বলার সময় শিল্পী রাজকুমার রায়ের কণ্ঠে ঝরে পড়ে কৃতজ্ঞতার সুর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here