The Beatles Story (দা বিটলস স্টোরি)…শ্রীজাত

0
1011
'Strawberry fields forever' Photo courtesy: Joy Sarkar, Beatles Museum, Liverpool, March 25, 2018
লাল ইটে গাঁথা পুরনো ধাঁচের বিলিতি বাড়িখানার আদত নাম দেখলাম “The Beatles Story”। ঢুকে বুঝলাম, গল্পই বটে। দুনিয়া কাঁপানো এই রক ব্যান্ডের এক্কেবারে গোড়ার দিন থেকে শেষ দিন অবধি টানা লিখে যাওয়া একখানা গল্প। বা দীর্ঘকবিতা। কিংবা হয়তো উপন্যাস। যা বলতে চাই, সব ওই বাড়িটার মধ্যে লুকিয়ে আছে।

এই লিভারপুল শহরেই ১৯৬০ সালে মানুষজনকে নিজেদের কথা আর গানবাজনা শোনানোর স্বপ্ন দেখেছিল সদ্য কৈশোর পার করা চার বন্ধু। জন লেনন, পল ম্যাককার্টনি, রিঙ্গো স্টার আর জর্জ হ্যারিসন। তার পরের ইতিহাস গোটা পৃথিবীর সঙ্গীতরসিকের জানা। যারা গানবাজনার তেমন আত্মীয় নন, তাঁরাও, দূরে জ্বলে থাকা বিয়েবাড়ির আলোর মতোই অন্তত The Beatles নামটুকুর সঙ্গে পরিচিত। কেননা এই গুবরেপোকা এক সময় বুঝিয়ে ছেড়েছিল, ব্রিটিশ আধিপত্য কাকে বলে।

প্রথম রেকর্ড
The Beatles-এর পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস আউড়ে যাবার জন্য একখানা ক্লিকের দূরত্বে হাজারখানা লিংক অপেক্ষা করছে। কিন্তু স্কুলপড়ুয়া এক কিশোরের উপহার পাওয়া প্রথম গিটারের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর যে-অভিজ্ঞতা, যে-গিটারের দু’একটা তার এখন ছেঁড়া, আর যার মালিকের নাম জর্জ হ্যারিসন, সে-অভিজ্ঞতার কোনও লিংক হয় না। নাম হয় না। এমনকী, বয়ানও হয়তো হয় না। হলদে হয়ে যাওয়া মার্কশিট সমস্ত, খুব বড়াই করে বলবার মতো নম্বরও যাতে নেই মোটে, কেবল উপরের দিকে লেখা আছে দুষ্টু স্কুলছাত্রের নাম, ‘পল ম্যাককার্টনি’। ওই ধূসর হয়ে আসা নম্বরগুলোই তখন ইতিহাসের মাইলফলকে লেখা দূরত্বের মাপ হয়ে ওঠে, যে বলে দেয়, বাদ হয়ে যাওয়া থেকে প্রবাদ হয়ে যাওয়ার দূরত্ব ঠিক কতটা। কোথাও রাখা ছোট্ট কোনও বাজনা, যা হয়তো কৈশোরে প্রিয় ছিল রিঙ্গো স্টারের। এভাবেই তাঁদের ছোটবেলা থেকে বড় হয়ে ওঠার গল্পে আমাদের আগে আগে ঠিক গুবরে পোকার মতোই টুকটুক করে এগোচ্ছিল ইতিহাস। সঙ্গীতের সেই ইতিহাস, পৃথিবীতে যার নজির নেই আর।
বাড়িটা, অনেকখানি গোলকধাঁধার আকারে তৈরি। খুব বড়সড় ঘর একটাও নেই বললেই চলে। বরং নিচু সিলিং-এর ঘরগুলো আঁকাবাঁকা করিডোর দিয়ে জোড়া। আলোও বেশ কমিয়েই রাখা একরকম। কখন যে এক ঘর থেকে অন্য ঘর হয়ে আরেক ঘরে ঢুকে পড়ছি, বুঝতে পারছি না। কেবল চোখ সরানো যাচ্ছে না এক মুহূর্তের জন্যেও। ছবি থেকে শুরু করে নথি, তথ্য থেকে শুরু করে দলিল, হেডলাইন থেকে শুরু করে ফুটনোট, বছর ধরে ধরে একের পর এক সাজানো আছে। আর সেই সাজানোর মেজাজখানা পরিপূর্ণ কোনও রক কনসার্টেরই। অন্দরসজ্জারও যে সাঙ্গীতিক ঘরানা হতে পারে, তা বুঝতে গেলে একবার এই বাড়িতে ঢোকা দরকার খুব।
এঁরাও পারেন কিছু সংরক্ষণ করতে। এমনিতেই পশ্চিমে গেলে সংরক্ষণের প্রতি এঁদের পরম যত্ন আর আগ্রহ দেখলে লজ্জায় আর আক্ষেপে মাথা নিচু হয়ে আসে, এঁরাও আরেকবার প্রমাণ করলেন, ইতিহাস কীভাবে আঁকড়ে ধরে থাকতে হয়, সেটা আলবাত এঁদের কাছেই শিখতে হবে। স্কুলের মার্কশিট থেকে The Beatles-এর প্রথম অফিসঘর, এঁরা হুবহু রেখে দিয়েছেন। রাস্তার ধারে ভিড় জমিয়ে চিৎকার করে ওঠা উন্মাদ অনুরাগীদের ছবি যেমন টাঙানো আছে দেয়ালে, তেমনই, হ্যাঁ, উড়োজাহাজের চারখানা সিটও খুলে এনে রাখা আছে পাশাপাশি, যে-চারখানা সিটে পিঠ এলিয়ে ব্রিটেন থেকে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছিলেন এই চার দিকপাল। যে-স্টুডিওয় রেকর্ড করা হয়েছে একাধিক প্রবাদ-হয়ে-যাওয়া গান, তার রেপ্লিকা যেমন আছে, তেমনই যে-গিটার, যে-ড্রাম কিট আর যে-মাইক্রোফোন নিয়ে ছোট্ট আকারে লিভারপুলেই পারফরম্যান্স শুরু করেছিল ছেলেদের এই ব্যান্ড, তাও সাজানো আছে মঞ্চের উপর।
স্টুডিও রেপ্লিকা
যে-গিটার, ড্রাম কিট আর মাইক্রোফোন নিয়ে ছোট্ট আকারে লিভারপুলেই পারফরম্যান্স শুরু
এই ঘরটায় ঢুকে একটা অন্ধকার চেয়ার টেনে নিয়ে একটু বসতেই হল। এতক্ষণে দেখে নিয়েছি The Beatles-এর পাওয়া যাবতীয় পুরস্কারের তালিকা, মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যা যথেষ্ট (যিনি দেখছেন, তাঁর)। যদিও ইদানীং চারপাশে দেখি যে-কোনও একখানা পুরস্কারই মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট (যিনি পাচ্ছেন, তাঁর)। দেখে নিয়েছি এলভিসের সঙ্গে এই চারমূর্তির কনসার্টের ছবি আর শিউরে উঠেছি সেই দিনখানায় শ্রোতাদের হৃৎস্পন্দনের মাত্রার কথা ভেবে। দেখে নিয়েছি এক আসরে The Beatles-এর সঙ্গে Simon আর Garfunkel-এর হাসিঠাট্টার মুহূর্তের ছবি, আর এদের সব গান এক লহমায় মনে পড়ে গিয়ে মাথা ভারী হয়ে উঠেছে। দেখে নিয়েছি সেই সময়কার একের পর এক টপ চার্টস আর থরে থরে রেকর্ড রাখা র‍্যাক। এইবার একটু বিশ্রাম দরকার। যেখানে বসলাম, ঠিক সামনেটায় সাজানো আছে স্টেজ, তার উপরে যন্ত্রপাতি। যেন ঘর ভরে উঠলেই একে উঠে এসে যার জায়গা নেবেন সেই চার শিল্পী, যাদের একবার কাছ থেকে দেখার জন্য, সামনে থেকে শোনার জন্য উন্মাদ ছিল গোটা পৃথিবী।
রেকর্ড ভাঙার রেকর্ড
ঘর ছেড়ে বেরোলাম যখন, পাশের একখানা আধখোলা দরজার ওপাশ থেকে সেতারের আওয়াজ পাচ্ছি। এবং, বলাই বাহুল্য, ভারী চেনা হাতের বাজ। এই বাড়িতে একজনের সেতারই বাজবার কথা, এবং দ্রুত সেই ঘরের দরজা ঠেলে দেখি, স্বয়ং সেতারটিও দাঁড়িয়ে আছেন কাচের আড়ালে। পণ্ডিত রবিশংকরের সঙ্গে The Beatles-এর সখ্য জগদ্বিদিত, সে-সময়ে The Beatles-এর ভারত সফরও কিছু কম সাড়া ফেলেনি। সেইসমস্ত ছবি যত্ন করে সাজানো আছে একখানি ঘরেই। আর যে-সেতার পণ্ডিত রবিশংকরের হাতে বেজে উঠেছিল The Beatles-এর খাতিরে, সেটি আজও কাজ করছে পাহারাদারের।
বিকেল হয়ে এসেছে, ফেরার তোড়জোড় এবার শুরু না করলেই নয়। কিন্তু একজনের ঘর দেখা বাকি যে! তাঁকে, এমনকী এঁরাও, একটু আলাদা করে, একটু শেষের দিকেই রেখেছেন। সত্যি বলতে কী, এই ব্যান্ডের চারজন সদস্যের মধ্যে তিনিই আমার সবচাইতে প্রিয়, কাছের মানুষ। জন লেনন। ওই মাপের গানলেখক কমই এসেছেন বলে টের পাই আজ। The Beatles শেষ পর্যন্ত এক হয়ে থাকতে পারেনি। এক দশকে সংঘ ভেঙে যাবার প্রবাদের মতোই, ইতিহাসের চূড়ায় উঠে ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছিল এই ব্যান্ড। যাদের বন্ধুত্বের নিদর্শন এঁকে রাখা হতো রুমালে ও কফিকাপে, তাদের ‘ব্রেক আপ’ সারা পৃথিবীকে এক লহমায় মূহ্যমান করে দিয়েছিল। লেনন লিখছিলেন নিজের জন্য গান, সকলের জন্য গান। চলে গিয়েছিলেন নিউ ইয়র্ক। পছন্দের অ্যাপার্টমেন্টে দিন কাটাচ্ছিলেন ইয়োকো ওনো’র সঙ্গে। এই বাড়িটার শেষ ঘর আর টানা লম্বা করিডোর জুড়ে কেবল লেননের ছবি, শহর ম্যানহাটনে তাঁর প্রতিদিনকার মুহূর্তের দলিল। সাদা কালোয় ধরে রাখা। প্রত্যেকটা ছবির মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠছিলেন জন, তাঁর মধ্যেকার জনবহুল চলমান শহরটাকে নিয়ে। একে লেনন, তায় নিউ ইয়র্ক। আমাকে বধ করবার আয়োজন সম্পূর্ণ যাকে বলে। একটা ছবি থেকে আরেকটা ছবিতে এগোতে ইচ্ছে করছিল না। তারপর যখন একখানা ছবিতে দেখলাম নিউ ইয়র্কে আড্ডা দিচ্ছেন জন লেনন আর স্বয়ং অ্যান্ডি ওয়ারহোল, আমার স্তব্ধতার বাকিটুকু পূর্ণ হল। কীভাবে ইতিহাস চিরকাল শ্রেষ্ঠদের দেখাশোনা আর আড্ডার বন্দোবস্ত করে দিয়ে এসেছে, এইটা ভেবেই মাথা নিচু হয়ে এল। পৃথিবীর এক শহর থেকে আরেক শহরের জাদুঘরে আমি তাড়া করে এসেছি অ্যান্ডি ওয়ারহোলের ক্যানভাস, বিস্ময় থেকে চ্যুত হতে পারিনি একবারও। কী কথা হতো, জন আর অ্যান্ডির মধ্যে? কী কথা হতে পারত পৃথিবীর সর্বকালের সেরা দুই শিল্পীর মোলাকাতে?
নিউ ইয়র্কে আড্ডা দিচ্ছেন জন লেনন আর অ্যান্ডি ওয়ারহোল
কথা বন্ধ হবার যে আরও কিছু বাকি ছিল, তা বুঝতে পারলাম করিডোর পেরিয়েই। একটা দুধসাদা কোণে, দুধসাদা ফরাসের উপর রাখা আছে একখানা দুধসাদা পিয়ানো আর গিটার। জন লেননের। তাঁর সময়ের। এই পৃথিবীর ইতিহাসের। আর ঘরময় বেজে বেড়াচ্ছে সেই আশ্চর্য গান, “Imagine, there’s no heaven”… ওইখানেই চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ, তারপর দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলাম জলের ধারে, বন্দরের শীতল বাতাসে।
একটা দুধসাদা কোণে, দুধসাদা ফরাসের উপর রাখা, একখানা দুধসাদা পিয়ানো আর গিটার। জন লেননের।
এই পৃথিবীকে কোনও গান শান্ত করতে পারেনি কোনও দিন, আজও পারে না। নইলে স্বর্গ খুঁজে নেওয়ার উপায় কি আমাদের কিছু কম ছিল? জলের ধারে, সন্ধেবেলার ছায়াপড়া ঠান্ডা জলের ধারে হাঁটতে হাঁটতে যথারীতি আমার পিছু নিলেন মির্জা, পৃথিবীর কোনও শহরে যিনি আমার পিছু ছাড়েন না। “Imagine, there’s no heaven’-এর অনুবাদ তো তিনি বহু যুগ আগেই করে রেখে গেছেন। “হম কো মালুম হ্যায় জন্নত কী হকিকত, লেকিন / দিল কে খুশ রখনে কো, গালিব, ইয়ে খয়াল অচ্ছা হ্যায়…” জল, কোনও কথা বলে না আর। লিভারপুলে সন্ধে নেমে আসে, দূর কোনও শান্তিহীন পৃথিবীর মতোই…

Author Profile

Srijato
Srijato
Srijato Bandopadhyay is a poet of the Bengali younger generation.He won the Ananda Puroskar in 2004 for his book Udanta Sawb Joker: All Those Flying Jokers. In 2014, he won the Filmfare Awards East for Best Lyricist for the song 'Balir Shohor' from 'Mishawr Rawhoshyo'.

His latest poetic composition 'Dhongso' was published in International Kolkata Bookfair 2018 along with another two works - 'Lymeric' & 'Facebook', a collection of his facebook posts.

Besides writing poems and songs, he also does anchoring and Public Speaking. Recently he made his acting debut in Srijit Mukherji's film Zulfiqar.

He has also attended a writer's workshop at the University of Iowa.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here