রুমাদি – শ্রীকান্ত আচার্য

0
2958

সময়টা বোধহয় সত্তরের দশকের মাঝামাঝি। বাড়িতে রেকর্ড প্লেয়ার থাকার সুবাদে মাঝেমাঝে টুকটাক রেকর্ড কেনা হত। একবার কিনে ফেলা হল একটি ইপি ডিস্ক … ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের গান। তার পর ঘুরে ফিরে অবিশ্রান্ত বাজতে থাকলো তিনটি গান … ‘বিস্তীর্ণ দুপারের’, ‘আজ যতো যুদ্ধবাজ’ আর ‘প্রথম না হয়, দ্বিতীয় না হয়’।
আমার বালক-মন’কে প্রায় আচ্ছন্ন ক’রে ফেলেছিল এই বৃন্দগান। সেই সঙ্গে রেডিও-তে সারাক্ষণ লেপ্টে থাকা আমার কান খুঁজে নিয়েছিল আরও একটি গানকে। সেটি হল ‘একখানা মেঘ ভেসে এলো আকাশে’। আবিষ্কার করলাম, ওই বৃন্দগানের নেতৃত্বে থাকা বিষাণের মতো যে কন্ঠটা আলাদা ক’রে শুনতে পাচ্ছি, এই অদ্ভুত মন-খারাপের গানও তারই গাওয়া। তিনি … রুমা গুহঠাকুরতা।

আবিষ্কারের তখনও বাকি ছিল। সত্যজিৎ রায়ের ‘তিনকন্যা’ ছবি প্রথম দেখি আমার কৈশোরে। ততদিনে দক্ষিণী-তে রবীন্দ্রসংগীত শিখছি, আর সব রকম গানের সঙ্গে রেডিও-তে বা ডিস্কে শোনা চলছে দিকপাল শিল্পীদের গাওয়া রবীন্দ্রনাথের অসামান্য সব নিবেদন।  কিন্তু ‘তিনকন্যা’ ছবিতে ‘মণিহারা’-এ ‘বাজে করুণ সুরে’ শুনে কেমন যেন সব ওলোট-পালোট হয়ে গেল। সেই রুমা গুহঠাকুরতা’কে এই গানে সম্পূর্ণ অন্যভাবে শুনে কেমন যেন বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম প্রথমবার।আমার এলোমেলো অগোছালো মাঝবয়েসে এসে নানা কারণে গানবাজনার সঙ্গে দীর্ঘদিন কোনো সম্পর্ক রাখতে পারি নি। ভাগ্যই আমাকে ঘুরিয়ে এনে ফেললো আমার ভালবাসার দুনিয়ায় … সেই হারিয়ে যাওয়া গানবাজনার মধ্যে। আমার উত্তেজনা সপ্তমে পৌঁছল যত না গানবাজনা ক’রে, তার থেকে অনেক বেশি সেই সমস্ত মানুষদের খুব কাছে থেকে দেখে, যারা আমার বাল্য আর কৈশোরের সুরের পৃথিবীতে আকাশ হয়ে ছিলেন। তাঁদের অন্যতম রুমাদি। নব্বইয়ের দশকের শেষদিকেই বোধহয় … একদিন একটি টেলিফোন পেয়ে রীতিমত থতমত খেয়ে গেলাম। ফোনের ও প্রান্ত থেকে কথা বলছেন আর কেউ নয় … রুমাদি স্বয়ং। ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমার মতো এক নগণ্য গাইয়েকে অংশগ্রহণ করার আমন্ত্রণ সরাসরি জানাচ্ছেন রুমাদি নিজেই। এমন ঘটনা আমি কোনোদিন স্বপ্নেও কল্পনা করি নি। এখনও মনে আছে, সেই সন্ধ্যায় ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের শিল্পীদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আমরা সবাই গাইলাম ‘আজ যতো যুদ্ধবাজ’ … আর আমাদের সকলের পাশে দাঁড়িয়ে গাইলেন রুমাদি’ও। এই অভাবনীয় সন্ধের ওই মুহূর্ত আমি কোনো দিন ভুলতে পারবো না।

এর ঠিক পরেই রুমাদি আমাকে এক দিন বাড়িতে ডেকে পরম যত্নে ডিনার খাইয়েছিলেন। অনেক গল্প আর স্মৃতিচারণা’র পর খাওয়াদাওয়ার পর্ব। অনেক কিছু উৎকৃষ্ট পদের মধ্যে ছিল একটি মুসুরির ডাল, যাকে স্বর্গীয় বললেও অত্যুক্তি হবে না, তার স্বাদ-গন্ধ আজও আমার রসনায় লেগে আছে। সারা সন্ধে রুমাদির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম, কথা শুনলাম, আর আমার মনের দিয়ে চলতে থাকলো গান আর ছবির মিছিল … রুমাদির গান, রুমাদির অভিনয়ের দৃশ্য। আমি কেবলই ভাবতে থাকলাম, স্বপ্ন দেখছি না তো ? আমি কি সত্যিই এই মানুষটার সান্নিধ্যেই আছি?

শারীরিক সুস্থতায় আর ফিরতে পারছিলেন না তেমন ভাবে, এ খবর জেনে মন বিষণ্ণ হচ্ছিল। কলকাতায় এসেছেন শুনে বছর দুয়েক আগে দেখতে গিয়েছিলাম ওঁকে। একেবারেই তখন ভগ্নস্বাস্থ্য, বেশিক্ষণ কথা বলাতেও অনীহা আর ক্লান্তি এসে গিয়েছিল। কিন্তু যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে হাসিটা কিন্তু একই রকম ছিল।

একমুঠো অনুরাগে মন ভরিয়েছিলেন হাজার মানুষের। একমুঠো স্নেহ এই অপাত্রে দান ক’রে তাকেও ধন্য করেছেন সারাজীবনের জন্য।

রুমাদিকে আমার প্রণাম। চিরশান্তি লাভ করুক তাঁর আত্মা, এই প্রার্থনা করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here