গ্রামোফোন রেকর্ডে রবীন্দ্রচর্চা- কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

0
156

রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আর পাঁচজন বাঙ্গালীর মতো আমারও উৎসাহ ও কৌতূহল অনেকদিন ধরেই। আর সেই কৌতূহলের সূত্রেই রবীন্দ্রনাথের গানের রেকর্ড খুঁজে চলা। রবীন্দ্রনাথ যে তাঁর সময়কালে এক বিখ্যাত গায়ক ছিলেন, এমনকি তাঁর গানের অসংখ্য রেকর্ডিংও হয়েছিল সেকথা আমি স্কুলের গণ্ডী পেরোতে না পেরোতেই জেনে ফেলি রেডিওর কল্যাণে। সেই যে আকাশবাণীতে শুনতাম বিখ্যাত ঘোষণা ‘এবার গ্রামোফোন রেকর্ডে  শুনবেন রবীন্দ্রসঙ্গীত…।’ সেই আসরেই আমার প্রথম কবিকন্ঠে গান শোনার অভিজ্ঞতা। তারপর একদিন মনে হল এইসব রেকর্ড আমাকেও সংগ্রহ করতে হবে। স্বপ্ন দেখতাম কালোরঙের চাকাটি ঘুরে ঘুরে গান শোনাচ্ছে, আর আমি সেই ‘নিপার’ নামধারী প্রভুভক্ত কুকুরটির মতো মগ্ন হয়ে বসে আছি ঘণ্টার পর ঘন্টা।
রেকর্ড সংগ্রাহক হিসেবে আমি অর্বাচীন। যে সময় রেকর্ড সংগ্রহ করতে শুরু করেছি সে সময়ে এদেশে আর নতুন রেকর্ড তৈরি হয় না। কাজেই আমার ভরসা বলতে পুরোনো রেকর্ড। তবে কিনা আশার কথা বলতে এই যে রেকর্ড সেই অর্থে কখনোই পুরোনো হয় না। আর খুব খারাপভাবে আঘাত না লাগলে সেটা নষ্ট হওার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ক্যাসেট , সিডির মতো নেহাৎ ঠুনকো প্রযুক্তির জিনিস নয় সে। অগত্যা ধীরে ধীরে শুরু হয় আমার অভিযান। কালক্রমে ঘরের কোণেই জমে ওঠে গ্রামোফোন রেকর্ডে ধৃত রবীন্দ্রনাথের গানের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস।

বই পড়ে জেনেছি রবীন্দ্রনাথের নিজের গলায় গান রেকর্ডিং-এর প্রথম প্রচেষ্টা হয়েছিল ১৮৯১-৯২ সালে। আর সেটি করেছিলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। পরবর্তীতে ‘কুন্তলীন’ খ্যাত হেমেন্দ্রমোহন বসু ১৯০৫-০৬ সালে কবিকন্ঠে বেশ কিছু গান রেকর্ড করেছিলেন। তাঁর রেকর্ড করা অন্তত চোদ্দটি গানের তালিকা তো পাওয়াই যায়। কিন্তু কিন্তু দুঃখের কথা হল রবীন্দ্রনাথের এইসমস্ত রেকর্ডিংগুলি মোমের সিলিন্ডার- রেকর্ডে গৃহীত হওয়ায় তা একেবারেই স্থায়ী হয়নি। ফলে এগুলি আজ আমাদের কাছে শুধুমাত্র ইতিহাস।রবীন্দ্রনাথের নিজের গলায় গান ও কবিতা আবৃত্তির যেসমস্ত রেকর্ড অনেক সংগ্রাহকের মতো আমিও কষ্টেসৃষ্টে  সংগ্রহ করেছি সেগুলো সবই ১৯২৬ সালের পরবর্তীতে রেকর্ড করা। এগুলি সবই বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে রেকর্ড করা এবং ডিস্ক- রেকর্ড আকারে প্রকাশিত। তখন এইসব রেকর্ড বাজতো দম- দেওয়া কলের গান যন্ত্রে। পরবর্তীতে এগুলিই আবার লং – প্লেয়িং রেকর্ডে প্রকাশ করে  হিজ মাস্টার্স ভয়েস কোম্পানি, সংক্ষেপে আমরা যাকে বলি এইচ. এম. ভি.। আমার নিজের আকাছে কবিকন্ঠের এই দু’ধরণের রেকর্ডই আছে। এদের মধ্যে দুষ্প্রাপ্যতম হল রবীন্দ্রনাথের নিজের গলায় আবৃত্তি করা ‘কর্ণকুন্তী সংবাদ’। এই রেকর্ডটির জন্য আমার গর্বের সীমা নেই।
১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ, তাঁর গান ও কবিতার রেকর্ডিং- এর ব্যাপারটি কপিরাইট আইনের আওতায় আনার আগে এরকম অনেক রেকর্ড বেরিয়েছিল যেগুলিতে কণ্ঠশিল্পীর নাম থাকলেও গানের সুরকার বা গীতিকারের নামের কোন উল্লেখ নেই। রবীন্দ্রনাথের গান প্রথম যিনি গেয়ে ডিস্ক- রেকর্ডে প্রকাশ করেন, তিনি হলেন পি.সি.বোস। গানটি ছিল ‘ওই ভুবনমনোমোহিনী’। সে সময় রবীন্দ্রনাথের গান অনেকেই ইচ্ছেমতো সুরে ও তালে গাইতেন। হরেন্দ্রনাথ দত্ত,জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী, রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামীর গাওয়া তেমন রেকর্ড আমার কাছেই আছে, যেগুলিতে রবীন্দ্রনাথের নামোল্লেখ তো নেই-ই, উপরন্তু সুরেও আছে নানারকম ভেজাল।

আমার নিজের সংগ্রহের সবচেয়ে পুরোনো রেকর্ডটি হল হরেন্দ্রনাথ দত্তের গাওয়া ‘ আজি মর্মরধ্বনি কেন’ ও তার উল্টোপিঠে ‘ আলোকের এই ঝরনাধারায়’। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৩-২৪ সালে। শুনেছি এই সব গান শুনে অসন্তুষ্ট রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের ভাণ্ডারী দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়ে সেইসব গানের কয়েকটি আবার নতুন করে রেকর্ড করিয়েছিলেন। অনেক খুঁজে সেই রেকর্ডও আমি সংগ্রহ করতে সমর্থ হই। রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ডের প্রথম পর্বে কবির গান নির্ভরযোগ্য সুরে ও শৈলীতে যাঁরা গেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অমলা দাশ,কনক দাশ(বিশ্বাস), সাহানা দেবী, মালতী ঘোষাল,সতী দেবী, সাবিত্রী কৃষ্ণান, অমিতা সেন(খুকু), উমা বসু। ভাবতে অবাক লাগে, এই পর্বের রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে বেশীরভাগই ছিলেন গায়িকা। মনে রাখতে হবে সে-যুগে ভদ্রঘরের মহিলাদের পক্ষে গানের রেকর্ড প্রকাশ করা সামাজিকভাবে অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বোন অমলা দাশ ও সত্যজিৎ রায়ের মাসি কনক দাশ(বিশ্বাস) ছিলেন এ বিষয়ে পথিকৃৎ দুই শিল্পী।

বেসিক ডিস্কে প্রকাশিত রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়াও চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের গানের প্রয়োগ ও তার রেকর্ডের হওয়ারও একটা ধারাবাহিক ইতিহাস আছে। ১৯৩৭-এ ‘রাঙা বৌ’ ছবিতে ছায়াদেবীর গলায় প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রয়োগ হলেও, জনমানসে প্রোথিত তথ্য হিসাবে সেই বছরেই মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মুক্তি’ ছবিতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রয়োগ ও তার রেকর্ড প্রকাশ একটি নতুন যুগের সূচনা করে। সেই ধারাবাহিকতায় একে একে প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ‘ডাক্তার’ ছবিতে পঙ্কজকুমার মল্লিক, ‘জীবন মরণ’ ছবিতে কে. এল .সায়গল, ‘উদয়ের পথে’ ছবিতে বিনতা রায়, ‘শেষরক্ষা’ ছবিতে বিজয়া দাসের (সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী, পরবর্তীতে রায়), কণ্ঠে অসামান্য সব রেকর্ড। দেশ স্বাধীন হবার পরে চলচ্চিত্রে রবীন্দ্র সংগীতের প্রয়োগ ক্রমেই বেড়ে চলে এবং আজও এই প্রবণতা দিব্যি বজায় রয়েছে। এই ধারাতেই কত সব অনবদ্য রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছে। যেমন ‘সন্ধ্যাদীপের শিখা’ ছবিতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে, ‘লুকোচুরি’ তে কিশোর কুমার ও রুমা দেবীর দ্বৈতকণ্ঠে গান। মনে পড়েছে  ‘চৌরঙ্গী’ ছবিতে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান কিংবা ‘মেঘ ও রৌদ্র’ ছবিতে মান্না দে-র কণ্ঠে পরিবেশিত গানের কথা। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসংগীতের শেষ রেকর্ডিং হল ‘দাদার কীর্তি’ ছায়াছবির। সেখানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও অরুন্ধতী চৌধুরীর গলায় পরিবেশিত গান দুটি আজ আমাকে আপ্লুত করে। রবীন্দ্রনাথের গানের রেকর্ডিংয়ের জোয়ার আসে কবির জন্মশতবর্ষ ১৯৬১ সালে। সেই সময় রেকর্ডিং প্রযুক্তিতেও আসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এতকাল ৭৮ স্পিডের গালার রেকর্ডে দুই পিঠে মাত্র দুটি গান শুনেই তৃপ্ত হতেন শ্রোতারা। উন্নততর প্রযুক্তিতে এবার প্রকাশিত হতে পারলো লং-প্লেয়িং রেকর্ড এবং অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির এস.পি ও ই.পি রেকর্ড। এই রেকর্ডগুলি তৈরির উপাদান আলাদা হওয়ায় তাদের ওজনও হল হালকা, কর গান পরিবেশনের সময় সীমাও গেল বেড়ে। স্বাভাবিকভাবেই এইসব সুবিধাকে পাশে পেয়ে গ্রামোফোন রেকর্ড দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো দেশ জুড়ে। রবীন্দ্রসংগীতও বিপুল জনাদরে গৃহীত হল শহর-গ্রামের সর্বত্র। নানাসময় শিল্পীদের প্রকাশিত বারো-চোদ্দটি গান সংকলিত করে প্রকাশিত হতে লাগলো লং-প্লেয়িং রেকর্ড। আমরা পেলাম কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুবিনয় রায়, নীলিমা সেন, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, সাগর সেন, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের, রাজেশ্বরী দত্তের মতন গুণী শিল্পীদের অসংখ্য এল.পি ও ই.পি রেকর্ড। ধ্বনি প্রক্ষেপনের দিক থেকেও রেকর্ডগুলি হয়ে উঠলো অনেক বেশি নিখুঁত ও সুন্দর। ফলে আজও এইসব রেকর্ডে গান শুনে ও শুনিয়ে অসম্ভব তৃপ্তি হয়। রবীন্দ্রনাথের গানের যন্ত্রানুষঙ্গের প্রয়োগ ও বিধি নিয়ে অনেক চর্চা হয়েছে বহুকাল ধরেই। আগেকার রেকর্ডে মাত্র তিন মিনিট সময়সীমার ভেতরে অনেক অসুবিধের মধ্যেও কেউ কেউ বিশেষ কোনো বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগে শ্রোতাদের চমকিত করেছেন। এমনকি শুধুমাত্র বাদ্যযন্ত্রতে রবীন্দ্রসংগীতের গানের সুর বাজিয়ে রেকর্ডও করা হয়েছে কবির জীবদ্দশাতেই। বঙ্কিমচন্দ্র ঘোষ ক্লারিওনেটে রবীন্দ্রনাথের গানের সুর বাজিয়ে একাধিক রেকর্ড করেছিলেন। কনক দাস (বিশ্বাস) তাঁর ‘গ্রাম-ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ’ গানে বুলা মহলানবীশের বাঁশির প্রয়োগে আমাদের মোহিত করেছিলেন সেই কোন কালে।  পরবর্তীতে বাদ্যযন্ত্রে ভি. বালসারা, বটুক নন্দী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতন শিল্পীরা রবীন্দ্রসংগীতের সুরের রেকর্ড প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এইসবের বাইরেও গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ওস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ, তার সেতারে বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি’-র সুর ভেঙে একটি অসামান্য গৎ সৃষ্টি করে ও তার গ্রামোফোন রেকর্ড প্রকাশ করে এক নতুন নজির সৃষ্টি করেন। সেই ঐতিহাসিক রেকর্ডটি আমার সংগ্রহশালার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলংকার। পরবর্তীতে নিখিল বন্দোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মতন বরণীয় শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথের গানের সুর ভেঙে গৎ তৈরি করে সংগীতের যে নতুন ক্ষেত্রটিকে সম্প্রসারিত করেন, বিলায়েৎ খানের সেই রেকর্ড তারই পথিকৃৎ-এর মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য।

রবীন্দ্রনাথের গানকে ঘিরে নানাসময়ে নানারকম রেকর্ডের প্রকাশ আমাদের সংগীতিক ইতিহাসের একটি অতি গুরুত্বপুর্ণ ক্ষেত্র। আর এ বিষয়টি যত চর্চিত হবে ততই আমরা বুঝতে পারবো সংগীত আমাদের সংস্কৃতিকে কতটা শক্তভাবে ধারণ করে আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here