নতুনরূপে বাংলা কথকতার ঐতিহ্যঃ ‘গপ্পো’ সিরিজ

0
1541

“ঠাকুমার ঝুলিটির মত এত বড় স্বদেশী জিনিস আমাদের দেশে আর কি আছে? কিন্তু হায় এই মোহন ঝুলিটিও ইদানিং ম্যাঞ্চেস্টারের কল হইতে তৈরি হইয়া আসিতেছিল। এখনকার কালে বিলাতের ‘’Fairy Tales’’ আমাদের ছেলেদের একমাত্র গতি হইয়া উঠিবার উপক্রম করিয়াছে।” – সেই কোন ১৯০৭ সালে দক্ষিণারঞ্চন মিত্র মজুমদারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ‘ঠাকুমার ঝুলি’ প্রকাশের সময়েই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বইটির ভুমিকার এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।

সন্ধ্যা-রাতের আলো-আঁধারিতে দিদিমা ঠাকুমার কোল ঘেঁষে গুটিসুটি হয়ে বসে লালকমল-নীলকমল, সোনারকাঠি-রূপোরকাঠি, সুয়োরানী-দুয়োরানীর রাজ্যে তা’রপর? তা’রপর? জিজ্ঞাসা করতে করতে পৌঁছে যাওয়ার সোনালী দিন কবেই হারিয়ে গেছে। চোখ বুজলেই সামনে এসে দাঁড়াত পক্ষিরাজ কিংবা সেই সাতভাই-এর এক বোন চম্পা। সেসব গল্প প্লটের বাঁধুনি, চরিত্র, চমক আজকের জে কে রাওলিং-এর চেয়ে কোনো অংশে কম যেত না। শিক্ষণ এবং শিখনের আধুনিক ধারণায় যেভাবে একজন ছাত্র বা ছাত্রীর  সৃজনশীলতাকে সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়াস চলছে তা অতীত দিনের এইসব গল্পকথকদের থেকেও পেতে পারি। নিজেদের অজান্তেই তাঁরা পরিপুষ্ট করতেন শিশুদের কল্পনার জগতকে যা উস্কে দিত তাদের সৃজনশীলতাকে। কিছু গল্পের পরতে পরতে আবার থাকত সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষাও।

উত্তর আধুনিক যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল – মানুষের পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা। বর্তমান সময়ের বিজ্ঞাপনের ভাষাই হল ‘Go solo ‘ । সেখানে পড়ার বইয়ের ভাঁজে গল্পবই লুকিয়ে পড়ার আনন্দগুলোও বদলে গেছে। টগবগ করে ঘোড়া ছুটিয়ে বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে রাজপুত্র আর কোটালপুত্র, ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমীর গল্প শেষে উড়ে চলে যাওয়া কিংবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সেই টুনটুনি তার মাথা হেঁট করে বেগুন গাছের ডালে ঠেকিয়ে এক বিড়ালকে বলছে, ‘পেন্নাম হই, মহারানী!’ ইত্যাদি বর্ণনাগুলি শুনতে শুনতে শ্রোতাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত নানা ছবি। প্রযুক্তির রমরমার ফলে গল্প পড়া কিংবা গল্প শোনার থেকে গল্প দেখার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে অনেক বেশি। ফলত, কথকের মুখে কোনো গল্প শুনে তার দৃশ্য, চরিত্রগুলি কল্পনার রসে জারিয়ে  আপন করে নেওয়ার যে স্বাধীনতা আগে ছিল বর্তমানে ছবির অতি প্রয়োগের ফলে তা হারিয়ে যাচ্ছে। প্রিয় উপন্যাস সিনেমার পর্দায় দেখে এই কারণেই বহু পাঠকের মন ভরে না কারণ তা নিজেদের কল্পনার ছবির পরিপূরক হয় না। তাছাড়া সহজলভ্য এই ধরনের গল্পগুলির সবকটিরই ভাষা ইংরাজি। বাংলা ভাষার যে বিপুল সাহিত্যসম্ভার এবং কথকতার ধারা তারসাথে বর্তমান প্রজন্মের সে অর্থে পরিচয়ই নেই। একান্নবর্তী পরিবারের ধারণা এখন আর নেই তাই ঠাকুমা দিদিমার কোল ঘেঁষে গল্প শোনা বা গ্রামে কথকদের কাছে বসে গল্প শোনার সুযোগও আর নেই। আর শুধু ছোটোরাই বা কেন আকর্ষণীয় গল্প শুনতে বড়োদেরও অনীহা থাকে কি? গল্প কথনের সেই ঐতিহ্যকে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে উপস্থাপন করাই ‘গপ্পো’ সিরিজের প্রয়াস। চলুন না সবাই মিলে সেইসব দিনের মতো বসে গল্প শোনা যাক-

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here