আলাপচারিতায় স্নিগ্ধদেব সেনগুপ্ত।

0
1452

নতুন বাংলা গান আজকাল আমাদের কাছে পৌছয় কম।ডিজিটাল যুগের কল্যাণে সব এখন আন্তর্জালে বন্দী। প্রায় হারিয়ে যাওয়া নতুন বাংলা গান নিয়ে কাজ যাতে শ্রোতাদের কাছে পৌছতে পারে মিউজিয়ানা সেই দায়িত্ব তুলে নিয়েছে নিজের কাঁধে। মিউজিয়ানা কালেক্টিভের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাই নতুন বাংলা গানের অনেক মুখ খুঁজে নিচ্ছেন সুর। স্নিগ্ধদেব সেনগুপ্ত নিজের সুরে ‘সমস্ত মন ভিজিয়ে দিলাম আজ’ গানটি নিয়ে এসেছেন সেই প্ল্যাটফর্মে। গানের জগতের কিছু কথা এই সুত্রে জেনে নেওয়া গেল তার কাছ থেকে।

ছোট ছেলেটি বছর তিনেকের জন্মদিনে বাবার সহকর্মী গৌতম মুখার্জীর কাছে উপহার পায় ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন” এর গানের ক্যাসেট।বাবার সহকর্মী গৌতমকাকুর হাত ধরেই আসে পরবর্তী অনুপ জলোটাজির ‘ভজন সন্ধ্যা’ ক্যাসেটটিও। অল্প একটু গুনগুন করে গাওয়ার চেষ্টা দেখে তাকে বাড়ি থেকে বলা হল বিভিন্ন ধরণের গান শোনার কথা।অনুপ জলোটার সাথে তখন যুক্ত হয়েছে গুলাম আলির গজলও। পরবর্তী সময়ে আজকালের সাংবাদিক অলোক চট্টোপাধ্যায় (যদিও ছেলেটির কাছে তিনি অলোক কাকু ) তাকে নিয়ে গেলেন দেবীরঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের কাছে। ‘জেঠু’ নামে ডাকা এই মানুষটির কাছেই ক্লাস থ্রি থেকে দীর্ঘ ১৮ বছরের তালিম এবং গানকে ভালোবাসা। সুরের জগতে পা দেওয়ার শুরুটা ঠিক কিরকম জানাতে গিয়ে অনেকটা এইরকমই বললেন ‘সমস্ত মন ভিজিয়ে দিলাম আজ’ এর গায়ক স্নিগ্ধদেব। এবার আসা গেল বাংলা গানের দিকে।

প্রশ্ন- রেডিওতে বাংলা গান প্রায় শোনাই যায় না। হাতে গোনা কয়েকটি চ্যানেল হয়তো নির্দিষ্ট কিছু সময়ে কিছু বাংলা গান চালায়।তাও হিন্দি গানের ভিড়ে তাদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।নতুন গান বেরনোর আগেই হারিয়ে যায় প্রায়ই। এই যে একটা ভয়ানক অচলাবস্থা, এই ব্যাপারে আপনার মত কি?

উঃ- কিছু কিছু ফিল্মের গান ছাড়া বাংলা গানের বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক অবস্থাটা ভালো নয়। কিছু নির্দিষ্ট শিল্পী, ব্যানার ও সঙ্গীত পরিচালকের কাজ ছাড়া বাংলা ফিল্মের গানের একটা বড় অংশ এবং অবশ্যই যেসব গান সিনেমার সাথে কোনভাবেই যুক্ত নয় তার বেশীরভাগটাই অবহেলিত থেকে যাচ্ছে বর্তমানে। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় গান এবং সুর নিয়ে বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে এবং সেই কাজগুলো শ্রোতাদের( যারা সংখ্যায় হয়তো অনেক কম)কাছেও পৌঁছচ্ছে। যদি মিডিয়ার সাহায্য পাওয়া যায় তাহলে হয়তো আরও বেশী করে পৌছনো যাবে শ্রোতাদের কাছে।তাই এই বাণিজ্যিক পিছিয়ে থাকার সাথে সাংগীতিক ভাবে পিছিয়ে থাকার কোন সম্পর্ক নেই কোনভাবেই। সাংগীতিক এগিয়ে চলাটা আছে এবং থাকবে বলেই মনে হয়।

তার এই দৃঢ় বিশ্বাসের রাস্তা ধরেই পৌছনো গেল পরবর্তী প্রশ্নে

প্রশ্ন-এই যে প্রবল ডিজিটাইলাজেশন তা কি কোনভাবে এই সাংগীতিক ভাবে এগিয়ে চলা তার পরিপন্থী হয়ে উঠবে না? শিল্পীরাও কি বঞ্চিত হচ্ছেন না?

উঃ- দেখুন শুধুমাত্র বাংলা গানের ক্ষেত্রে ভালো খারাপটা বিচার করা খুব মুশকিল। কারণ এটা এমন একটা রুপান্তর যেটা গোটা পৃথিবীতেই হয়েছে। শুধু বাংলা নয়, অন্যন্য ভারতীয় ভাষার গান,ভারতের বাইরের গানেরও এখন ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন হচ্ছে। লোকে গান শোনা, গান কেনাকেও ওয়েব বেসড করে তুলেছে। এটা বাধ্যতামূলকই হয়ে পড়েছে একপ্রকার।বাংলা গানের শ্রোতাদের মুশকিল হয়ে গেছে অন্য জায়গায়। বাংলা গানের শ্রোতাদের একটা বড় অংশ ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার সম্পর্কে সড়গড় নয়। ধরুন একটা গান অনলাইন রিলিজ হওয়ার পরে কোথায় গেলে সেই গানকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে, অথবা কোন লিঙ্কে ক্লিক করতে হবে সেটা অনেক লোকই জানেন না। তাই সেই গান খুঁজে পাওয়া এবং শোনার ক্ষেত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে যেটা হয়তো কাম্য নয়।আমার নিজের বাড়িতেও এই একই সমস্যা আছে।যদি বর্তমান প্রজন্মকে গানের আরও কাছাকাছি আনা যায় তাহলে হয়তো এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।কিন্তু কিছু কিছু গান যা ধরুন অনেক আগে থেকেই চলে আসছে তা এখনকার প্রজন্মের পছন্দ নাও হতে পারে। আবার তাদের পছন্দ করানোর জন্য একটা পুরনো গানকে শুধুই অতিরিক্ত বাজনা দিয়ে কিম্ভূতকিমাকার বানিয়ে ফেলাও উচিত নয়। এই যে একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে এটা পূরণ করার কোন নির্দিষ্ট উপায়ও নেই।

প্রশ্ন: ডিজিটালাইজেশন যেমন একটা সমস্যা তেমনি আরো এক সমস্যার কথায় আসা যাক। ধরুন আপনি নতুন গান গাইছেন। শ্রোতাদের কাছে পৌছতেও চাইছেন কিন্তু দেখছেন অন্য একজন শিল্পী যার নাম আছে তিনি শুধুমাত্র একটা পুরনো গানের কভার গেয়ে সমস্ত লাইমলাইট টেনে নিলেন নিজের দিকে,এইরকম সময়ে আপনার শ্রোতাদের প্রতি অভিমান হয়? না ভালো কাজ করার ইচ্ছেটা আরো বেড়ে যায়?

উঃ ভালো কাজ করার ইচ্ছা অবশ্যই বাড়ে। আর বর্তমানে গানের জগতে টাকাপয়সা নিয়ে অনেকেই আসছেন যারা নিজেদের গান শুধুমাত্র টাকাপয়সার জোরে অনেক লোকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন যেটা হয়তো সাধারণ জায়গা থেকে যারা গান করতে আসছেন তাদের পক্ষে কোনমতেই সম্ভব নয়। অভিমান হলে শ্রোতাদের উপর না হয়ে ঐ পয়সা দিয়ে প্রচার পাওয়া লোকেদের উপর হচ্ছে নিশ্চয়ই। কারণ যেকোনো ফাইন আর্টস যদি শুধুমাত্র টাকার বিচারে প্রচার পায় সেটা ঐ শিল্পমাধ্যমেরই ক্ষতি ডেকে আনে।

সম্প্রতি কাজ করেছেন মিউজিয়ানার সাথে। তাই এত গুরুগম্ভীর সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার পর ফিরে আসা গেল তার সেই অভিজ্ঞতার কাছেই।

প্রশ্ন: মিউজিয়ানার সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা যদি একটু বলেন।

উঃ শ্রোতা হিসেবে তো মিউজিয়ানার সাথে আছি প্রথমদিন থেকেই।আরেকটু বেশী জড়িয়ে আছি বললেও খুব ভুল বলা হবে না। কারণ যাদের হাত ধরে মিউজিয়ানার শুরু সেই শ্রীকান্তদা ,অর্ণাদি, রাজীবদা ব্যক্তিগতভাবে আমার সাথে পরিচিত মিউজিয়ানা শুরুর বহু আগে থেকেই। মিউজিয়ানা যখন আত্মপ্রকাশ করলো তখন সবার সাথে তারা আমাকেও জানিয়েছিলেন। সেইসময় ফেসবুকে ‘ফ্রেন্ডস অফ মিউজিয়ানা’ নামে একটি পেজের সাথেও আমরা বেশ কয়েকজন যুক্ত ছিলাম। তাই মিউজিয়ানার কাজ সম্পর্কে জানতাম। এরপর যখন তারা মিউজিয়ানা কালেক্টিভের রূপে এলেন এবং আমাদেরও সেখানে গান গাওয়ার সুযোগ এল তখন শিল্পী হিসেবে অবশ্যই ভালো লেগেছিল। কিন্তু প্রত্যক্ষ যোগাযোগ থাকায় ঘরোয়া পরিবেশে পছন্দের লোকদের সাথে কাজ করাটা সেই ভালোলাগাটাকেই বাড়িয়ে তুলেছে আরও খানিকটা এবং ভালো কাজ করতে অনুপ্রানিত করেছে সবসময়।বেঙ্গল ওয়েব সলিউশন ডিজিটাল মিডিয়ায় আমার গান কিভাবে পৌছবে এবং ঠিক কিভাবে বেশী সংখ্যক দর্শকের কাছে ছড়িয়ে যাবে আমার কাজ সে নিয়ে আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে। সুতরাং আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বেশ ভালো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here