ঢোলের জাদুকরঃ বলরাম হাজরা।

0
1453

“মোকে খালি ঢোলক নাগে। গান আর ঢোল ছাড়া মুই আর বাঁচিম না রে বাউ।” ২০১৭ সালের ২১ ডিসেম্বর সুবীর সরকারের সাথে কথোপকথনের সময় এমন কথাই বলেছিলেন ‘ঢোলের জাদুকর’ বলরাম হাজরা। বাংলাদেশ রংপুরের ঠাকুরগঞ্জ গ্রাম তাঁর জন্মস্থান। অখ্যাত গ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চের শিল্পী কীভাবে হয়ে ওঠা যায় তার উজ্জ্বল উদাহরণ বলরাম হাজরা। শিল্পীর জীবন বোলে তাল কাটে ২০১৮-এর ১০ই এপ্রিল। বাহাত্তর বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মাত্র দশ বছরে বয়সে জ্যাঠামশাই সরল হাজরার কাছে তাঁর হাতেখড়ি। রংপুর অঞ্চলে তিনি ছিলেন ওস্তাদ ঢোল বাদক। গ্রামে যাত্রা, কবিগানের প্রচলন ছিল। ঢোল বাজানোর প্রতিযোগিতাও হত। সেসব প্রতিযোগিতায় মেডেল আনতেন সরল ওস্তাদ। এই অভিজ্ঞতাগুলিই শিল্পীর শিশুমনে স্বপ্নের রঙের ছোঁয়া দিয়েছিল। সে যেন এক অন্য জগতের হাতছানি।

পঞ্চাশের দশকে বলরাম হাজরা কাঁটাতার পার করে ভারতে এসে জলপাইগুড়ি আলিপুরদুয়ারের একটি গ্রামে জীবনযাপন শুরু করেন। পেশাদার ঢোলবাদক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে শিল্পী বলরাম  বিভিন্ন যাত্রাদলে তো বটেই এমনকি কোচবিহারের বিড়ি কোম্বানির স্ট্রিট-বিজ্ঞাপনের জন্যও  বাজিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে, আলিপুরদুয়ারের টেপু বাদ্যকরের কাছে টানা দশ বছর শিক্ষাগ্রহণ করে  তালিম সম্পূর্ণ করেন। অসমিয়া বিহু ঢোল, ভোজপুরী এবং পাঞ্চাবী ঘরানার ঢোলের বাদ্যরীতিও তিনি যত্ন করে আয়ত্ত্ব করেছিলেন। ঢোলের পাশাপাশি তবলা, পাখোয়াজ, খোল অর্থাৎ লোকসঙ্গীতের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রও তিনি স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে বাজাতে পারতেন। দ্বিতীয় দফায় জিতেন ভট্টাচার্যের সান্নিধ্যে-ধ্রুপদ, ত্রিতাল অর্থাৎ মার্গসংগীতের ঘরানার তালিম সম্পূর্ণ করেন।

বলরাম হাজরার জগতজোড়া পরিচিতি মূলত ঢোল বাদক হিসাবে হলেও অনেকেই গায়ক বলরাম হাজরা সম্পর্কে অবগত নন। ভাওয়াইয়া এবং কীর্তন গায়নে তিনি যথেষ্ঠ দক্ষ ছিলেন। তিনিই প্রথম ভাওয়াইয়া, বিষহরা গানে বাংলা ঢোলের প্রচলন করেছিলেন। ২০০৫ সালে ‘আব্বাসউদ্দিন পুরস্কার’ লাভ করে তিনি শিল্পীমহলে পরিচিতি পান। এরপর একের পর এক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কারে তিনি সম্মানিত হন। যারমধ্যে উল্লেখযোগ্য মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ২০১৭ সালের ‘বঙ্গরত্ন’ সম্মান।

ব্যতিক্রমী ধারার শিল্পীদের অভাবী যাপন এবং অর্থকষ্ট যেন অনস্বীকার্য সত্যে পরিণত হয়েছে। যে মানুষটির খ্যাতি জগতজোড়া সেই মানুষটি জীবনের শেষ কটি দিন যাপন করেছেন নিদারুণ অর্থাভাবে। ক্যান্সারের ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু, তাঁর স্বপ্নের কথা জিজ্ঞাসা করলে অভাবী জীবন নিয়ে আক্ষেপের সুর তাঁর স্বরে ছিল না। আগামী প্রজন্মের হাতে ঢোলের কাঠি তুলে দিয়ে এই বাজনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথাই তিনি বলেছিলেন। শিল্পের জগতে তাঁর চলে যাওয়া এক অপূরণীয় ক্ষতি। আপনাদের জন্য রইল ঢোলের জাদুকরের জাদুর এক পর্ব-

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here