জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে – অমিত গুহ

0
452

জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে
বন্ধু হে আমার রয়েছো দাঁড়ায়ে

যতবার গানটার কাছে পৌঁছাই, দেখতে পাই একটা কুয়াশা ঘেরা রাস্তা আর তার মধ্যে দিয়ে একটা ট্রেন এগোচ্ছে। আর পার করছে দুটো স্টেশন, জীবন আর মরণ। তার নেক্সট স্টেশন কি হবে? ওই যে বলা আছে সীমানা ছাড়ায়ে, একটাই সপ্তকে একটাই শব্দে গানটা যেন পেরোচ্ছে এক দিগন্ত। গা গামা মাগা পা তিন স্বরের মধ্যে দিয়ে যেন ট্রেন এগোলো।’ছাড়ায়ে’ আর যখন শেষ হল দেখলাম কোথায় এসে দাঁড়িয়ে আছি আমি? দাঁড়িয়েছি আলোকময় এক বন্ধুর সামনে যে বন্ধুই আমার ট্রেন এর লাস্ট স্টেশন। আমার দুঃখ যার কাছে আশ্রয় চাইছে। ধা থেকে সা এর মীড় যেন আমার কান্নার আশ্রয় হচ্ছে এই মুহূর্তে।

অন্তরা থেকে গান প্রবেশ করলো উজ্জ্বল এক বর্ণনায়। এ মোর হৃদয়ের বিজন আকাশে/ তোমার মহাসন আলোতে ঢাকা সে। বিজন অর্থাৎ শূন্য,অর্থাৎ যাতে পা রাখেনি কোন প্রাণ, যাতে আখর লেখেনি কোন হৃদয়। যাকে ছুঁয়ে দেখেনি কোন হাত। এই শব্দ এখানে বসছে হৃদয় আর আকাশের মাঝে। আর তৈরী করছে এক অদ্ভুত শব্দ মন্ডলী যার মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে এক অবিচ্ছেদ্য শূন্যতা।
তারপরই আমি বলছি ‘তোমার মহাসন আলোতে ঢাকা সে’। মহাসন? এর মানে কি হতে পারে? এক এমন মহার্ঘ আসন যে খানে আমি বসাইনি কাউকেই তাই আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। কিন্তু তার পর যখন বলছি ‘আলোতে’ তখন সেই আলো যেন সত্যি আলো নিয়ে আসছে ওই মহাসনে। সানি নি নিপা হয়ে গড়িয়ে যেন আলো নামছে। মহাসনের আলো ভরিয়ে দিচ্ছে চারপাশ। সুরের আলোয় আমার মহার্ঘ সঞ্চয় ও ঢাকা পড়ছে। তারপর আমি হারিয়ে ফেলছি নিজেকে। যেন ছুটে চলছি তাঁর দিকে। ‘গভীর কি আশায় নিবিড় পুলকে / তাহার পানে চাই দু বাহু বাড়ায়ে’। আমি আনন্দে আর আশায় হাত বাড়াচ্ছি সেই অদেখা বন্ধুর উদ্দেশে। গভীর এখানে আর মন্দ্র নয় সে ছুঁয়েছে তার সপ্তক। আর আশার গভীরতার বিপুলতা আমি ছুঁয়ে আসছি এক্সট্রিম এক সুরের প্রকাশে। বহু আন্দোলনের পর যেন দু বাহু বাড়ায়ে এক তৃপ্তির প্রকাশ আনছে আমার গানের শরীরে।

গানের সঞ্চারী একটা ডেসক্রিপশন। এক চিত্রকরের স্থির ছবির মত। আমি অনেক শান্ত এখন নীরব নিশি তব চরণ নিছায়ে/ আঁধার কেশ ভার দিয়েছে বিছায়ে। তার মানে কি দাঁড়ায়?সমস্ত অন্ধকার তাঁর পায়ে বিছিয়ে দিয়েছে নিজের বিস্মিত নিস্তব্ধতা? নিজের কেশভার ছড়িয়েছে সেই বিপুল মূর্তির সামনে? নিশি মানে কি? রাত্রির এক ঘোর দশা। সেই বিপুল অন্ধকার কেন ছড়ালো তার পায়ে?ছড়ালো কি তার অন্তহীনতা বুঝাতে? নীরব নিশির আঁধার কেশভার পরপর শব্দগুলো বসিয়ে কি দেখি? দেখতে পাই এক অসম্ভব অন্ধকারের ছবি যা এতক্ষনের আলোর সাথে এক অর্থে কনট্রাস্ট। এই আলোর শরীরে এমন অন্ধকারকে কি মৃত্যুর রূপক করে তুলে ধরছি আমি?

দ্বিতীয় অন্তরায় প্রবেশ করেই গান আবার ফিরছে নিজের পুরানো রাস্তায়, যে রাস্তায় মধ্য সপ্তক থেকে সে পাড়ি দেয় তার সপ্তকে। কিন্তু এ কোন গান যে গান কে আমি দেখতে পাচ্ছি? এই মহান সঙ্গীত কি নিয়ে আসছে আমার কাছে? এই গানই কি তবে কোন ভূবন ভোলানো ডাক যা পার করছে অন্তঃরীক্ষের অন্ধকার? আমার গানের মধ্যে যেন তোমার গান এসে মিশছে। তোমার আর আমার গানের এই অপরূপ সুরের অনুরণনই কি খুলে দিচ্ছে লৌকিক আর অলৌকিক জগতের সমস্ত রাস্তা? গানের বেদনা তাই বা কেমন?কেন বাছলাম এমন অদ্ভুত শব্দ, ‘বেদনা’?নিজের মধ্যেই আমি খুঁজছি আমার ব্যথা কে। আমার এই গান যখন এই লোকের সমস্ত স্তর পেরিয়ে ব্যথার আশ্রয় নেয়, তখন সেই আলোকিত অজানা এসে ধরা দেন সেই ব্যথার মাঝে। এই বেদনার মধ্যেই হারাবো আমি। আমার সমস্ত আমিত্ব কে একাকার করে আমি এখানে মিশছি এক অনন্ত অরূপতায়। সেই অলৌকিক অরূপ গানে আমার পৃথিবী ভাসছে আর মিলিয়ে দিচ্ছে কুয়াশা ঢাকা সেই আলো আঁধারি স্টেশনের সাথে। মরণের পরের স্টেশন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here