যে গানের হাত ধরে শেখা – ২ – বিপুলজিৎ বসু

0
1233

‘ব্রাত্য’ শব্দটার সঙ্গে নিপীড়নের একটা যোগ আছে সামাজিকভাবে। যে মানুষটা ক্ষমতার পিরামিডে শেষ প্রান্তে থাকে, সে যে সহজেই পীড়নের শিকার হয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। দেশে দেশে, অঞ্চল বিভেদে নিপীড়নের রকম পাল্টে যায় রাজনৈতিক, সামাজিকভাবে। ২০১৪ তে এসে হিংসার সূক্ষ্মতা ও ব্যপ্তি, গত শতকের থেকে আলাদা। এখন হিংসা অনেক বেশি মনস্তাত্বিকও বটে।

 

বাংলা গানে (Bengali Music) হিংসা বিরোধী, দাঙ্গা বিরোধী, প্রতিবাদী গানের পাতলা হলেও, পোক্ত ঐতিহ্য আছে। শুরুটা যদি রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে স্বদেশী আন্দোলনের সময় (১৯০৫ ) থেকে করি, তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময় হয়ে গণনাট্য আন্দোলনের গানে সলিল চৌধুরী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্র, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ভূপেন হাজারিকা, পরবর্তীকালে সবিতাব্রত দত্ত, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, কবীর সুমন, মৌসুমি ভৌমিক,  বিপুল-অনুশ্রী, পল্লব কীর্তনিয়া,  ধারাটা কম দীর্ঘ নয় ( কয়েকজনের নাম হয়ত বাদ গেল, এর সঙ্গে যোগ করে আমাকে সমৃদ্ধ করতে পারেন)।  বেসিক রেকর্ডের বানিজ্যিক আধুনিক বাংলা গান যার শুরু যদি ধরি পঙ্কজ কুমার মল্লিক ও কমল দাশগুপ্তের হাতে, এবং সিনেমার গানের পরিসরের মধ্যেই খুবই বিক্ষিপ্তভাবে, মাঝেমধ্যে, সময়োপযোগীভাবে হিংসা বিরোধী গান তৈরি হয়েছে, জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। কিন্তু অন্যতম ধারা হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি।

 

এই যে জুলেখা শেখের গল্পটা বললাম, একজন এইচআইভি পজিটিভের জীবনে সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে ওমন অদ্ভুত সুন্দর নান্দনিক লড়াই, প্রেমকে হাতিয়ার করে- এর হদিশ সমাজ জীবনেও নতুন (১৯৮৬ এর আগে অসুখটা এ’ দেশে ছিলই না)! এইচআইভি/এইডস ডিসকোর্সটা স্বাস্থ্য পরিষেবা কাজকর্মের মধ্যেই আটকে আছে। আমাদের সামাজিক দর্শনকে প্রভাবিত করতে পারেনি। ফলে বাংলা গানে তাঁর ভুরিভুরি নমুনা থাকবে কীভাবে !

 

হিংসা বিরোধী গানের কথা যখন উঠলই, একটা গানের কথা মনে পড়ছে। গানটা শুনেছি প্রকাশিত হবার অনেক পরে। এখানে প্রেক্ষিতটা বলে নি। ১৯৬০ সাল। অসমে ভাষাকে কেন্দ্র করে  বাঙালি অহমিয়া জাতি সংঘর্ষ তীব্র হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষায় কথা বলা প্রায় নিষিদ্ধ। অসম থেকে উৎখাত করা হতে থাকে বাঙালি। কার্ফু জারি হয়ে গেছে চারিদিকে। সেই অবস্থায় শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং ভূপেন হাজারিকা সংঘর্ষ কবলিত জায়গাগুলোতে একটা গান বাংলা ও অহমিয়া ভাষায় গেয়ে বেড়াতে লাগলেন। গানটি রঙ মন মাঝি।

 

পদ্মার তুফান উরাইয়া নিলো/ আমার সুখের ঘর/ উজান ঠেইল্যা আইলাম আমি/ দুই পারে চর/ আর আমার ভাঙা নাওয়ে বন্ধু/ তুমি দিলা পাল/ আর ধরলাম বইঠা বন্ধু/ তুমি ধরলা হাল/ এ’ মিলন গাঙে আনলো বলো কে বিভেদের বান/ ঘর ভাঙিল, চর ভাঙিল/ ডুবলো সোনার ধান/

 

 

এরপর ২০০২-০৩ সাল। বইমেলা চত্বর। এটা সেই সময় যখন কেশপুর, নানুর, ছোট আঙারিয়া, আরামবাগ, পশ্চিমবঙ্গের এই অঞ্চলগুলোতে শাসক বিরোধী সংঘর্ষে কত মানুষ মরছে, গাঁ কে গাঁ ফাঁকা করে মানুষ পালাচ্ছে অন্য আশ্রয়ের খোঁজে। ওদিকে গুজরাটেও ধর্মভিত্তিক দাঙ্গা শুরু হয়েছে । দাঙ্গা বলা ভুল, জেনোসাইড । সংখ্যালঘু মারা হচ্ছে বেধড়ক ।

 

তা, এই সময়ে কোনও একদিনে, বইমেলাতে কবি মণিভূষণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা। স্কুলে ওনাকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি। শুরুর দিকের মকশো করা লেখাগুলো উনি দেখতেন টিচার্স রুমে বসে। দেখিয়ে দিতেন ছন্দ, নামকরণ করতেন, খাতা বাড়ি নিয়ে চলে যেতেন, পরের দিন মাঝেমধ্যে সেই খাতা আবিস্কার করতাম অন্য কোনও টিচারের হাতে। স্যার দিয়েছেন তাঁকে লেখাটা পড়তে।

 

অনেকদিন পর দেখা হওয়ায় হাতটা ধরলেন আমার। উষ্ণতা টের পেলুম। মাইকে গান বাজছে। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের- আমাদের যেতে হবে, দূরে বহু দূরে…। সন্ধ্যে তখন নামে নামে। হাজার হাজার মানুষের পায়ের চাপে বাতাস ধুলোয় ধূসর। আমরা দুজন মানুষের ভিড়ের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে । সেদিন অনেক কথা হল। ভয়াবহ মারদাঙ্গা ওনাকে ভীষণ পীড়িত করছে বুঝলুম। কিন্তু উনি আশাবাদী। ওনার কথা আমাকেও আশান্বিত করল। রাতে ট্রেন ধরে বাড়ি ফেরার পথে লিখে ফেললুম গানটা-

 

  • চলি আমি কবির দিকে/ চলি আমি নদীর দিকে/ কবি যেন নদীর মতই/ চোরস্রোত ছুটছে বুকে/ যত কিছু বাদ প্রতিবাদ/ যত কিছু রক্ত লড়াই/ জেনে রেখো কবির কাছেই/ পুড়ে হবে সব কিছু ছাই/ জেনে রেখো কবির কাছেই/ পুড়ে হবে সব কিছু ছাই/………।

(PC – Google Images)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here