পুজোর গানের ইতিবৃত্ত – বিপুলজিৎ বসু

0
840

শুরুর কথা

সময়টা ছিল ১৯১৪-এর শরৎ । আজ থেকে ১০১ বছর আগের কথা। গ্রামাফোন কোম্পানির হাত ধরে প্রথম বঙ্গ জীবনে শারদীয়া পুজোর গানের প্রবেশ ঘটে । কীভাবে হল বলি । সময়টা খেয়াল করুন । প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে সবে । অর্থনৈতিক মন্দা ঘনিয়ে আসছে । যুদ্ধের ডামাডোলে গ্রামাফোন কোম্পানি পুজো উপলক্ষ্যে তাঁদের ‘ শারদাবলী’ ডিস্ক প্রকাশের কথা ঘোষণা করে । এটাই ছিল সে বছর তাঁদের ‘ফেস্টিভ অফার’ ।

১৪ টা ভিনাইল ৭৮ আরএমপি ডিস্ক প্রকাশিত হয় । দু পিঠে একটা একটা করে গান । শিল্পীরা ছিলেন মানদাসুন্দরী দাসী,  সরলা বাই, নারায়ন চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, কে মল্লিক, বেদানা দাসী, মিস দাশ, কৃষ্ণা দামিনী, মালতিমালা দাসী, চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অভয়পদ চট্টোপাধ্যায়, শশীভূষণ দে, অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন গোস্বামী, দক্ষিনারঞ্জন গুহ । দুটো সামাজিক দ্যোতনা ছিল এই উদ্যোগটাতে ।  এক, এদের মধ্যে, মিস দাশ ( অমলা দাশ) ছিলেন দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জন দাশের বোন । সম্ভবত, প্রথম বাঙালি গায়িকা যিনি ‘ সম্মানীয়’ কোনও পরিবার থেকে এসেছিলেন । বাকি গায়িকারা ছিলেন পেশায় ‘বাইজি’। দুই,  কে মল্লিক, যিনি ধর্মে একজন মুসলিম ছিলেন ( পুরো নাম মোহাম্মদ কাসেম মল্লিক)। কিন্তু গায়ক পরিচিতির ক্ষেত্রে নিজের ধর্মকে গোপন রাখেন। অনুমান করা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শ্রোতাদের আনুকুল্য পাওয়াই এর কারন ছিল ।   প্রতিটা ডিস্কের দাম রাখা হয় ৩ টাকা ১২ আনা ।

ছবিটা সেই বছর থেকেই বদলাতে শুরু করে । বলতে পারেন বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে মাইল ফলক পোঁতা হয়ে গেল ।  গ্রামাফোন কোম্পানির ‘শারদাবলী’ সাড়া পেল অভূতপূর্ব । সেই ব্যবসার বহর দেখে পরের বছর থেকেই সমসাময়িক পাইয়োনিয়ার রেকর্ড, হিন্দুস্থান রেকর্ড, ইয়ং ইন্ডিয়া রেকর্ড, এবং রিগাল রেকর্ড, প্রত্যেকে পুজোর গান প্রকাশ করতে শুরু করে ।

ধারা বয়ে যায়

তবে রমরমাটা শুরু হয় ১৯৩০-এর দশক থেকে ।  পুজো উপলক্ষ্যে গানের বাজারটা বড়ো হয় । প্রথমদিকের  ভক্তিগীতি বা আগমনীর গানের হাত ধরে আধুনিক বাংলা গানের প্রবেশ এই সময়েই।  ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত কমল দাশগুপ্তের সুরে  যূথিকা রায়ের ‘ আমি ভোরের যূথিকা’ এবং ‘ সাঁঝের তারকা আমি’ ঝড় তোলে । পরের দিকে বহু শিল্পী জনপ্রিয় হন শুধুমাত্র পুজোর গান গেয়ে । রবীন্দ্রনাথও এর আকর্ষণ এড়াতে পারেন নি । ১৯২২ সালে প্রকাশিত হরেন্দ্রনাথ দত্তের কণ্ঠে ‘ দেশ দেশ নন্দিত করি’ ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রথম শারদ অর্ঘ্য।

গ্রাফ নামে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে । ততদিনে লং প্লেয়িং থেকে ক্যাসেট-ভিডিও টেপের জমানা শুরু হয়েছে । দু’পিঠে দুটো মনোগ্রাহী গানের বদলে ক্যাসেটের জন্য ১২-১৪ টা গানের জোগান দিতে শুরু করেছে শিল্পীরা । ব্যবসার পতন্মুখ অবস্থা দেখে রেকর্ড লেবেল কোম্পানিরা শিল্পীর টাকাতেই ক্যাসেট প্রকাশ শুরু করল । ফলে বেনোজল ঢুকতে শুরু করে হু হু করে । গাওয়া এবং গাইতে পারা তো এক নয় । এই অবকাশে দ্বিতীয় শ্রেণীর শিল্পীর সংখ্যা বাড়ে প্রচুর। মান নেমে যায় বাংলা আধুনিক গানের ।

অবস্থা সঙ্গীন হতে শুরু করে সঙ্গীতে ডিজিটাইজড যুগ শুরু হবার পর। ক্যাসেট-সিডির যুগ টপকে গান-বাজনা এখন ‘ভার্চুয়াল’ জগতে এসে পৌঁছেছে। ১৫-৩৫ বছর বয়সী যারা সঙ্গীতের মূল বানিজ্যিক শ্রোতা তাঁরা ইন্টারনেটে সরে গেছে । তাঁদের কাছে গান শোনার মূল মাধ্যম ফোন সেট। ফলে বানিজ্য সামগ্রিকভাবেই তলানিতে। পুজোর গান তো আর আলাদা ব্যতিক্রম হতে পারে না ।

বিকল্প কী ?

তাহলে কয়েক প্রজন্মের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুজোর গানের ভবিষ্যৎ কী ? ইন্টারনেট অবশ্য বিকল্প রাস্তা দেখাচ্ছে । এখন ইউটিউবে প্রকাশ পাচ্ছে  গান। ডিজিটাল মার্কেটিং নতুন দিগন্ত দিশা । সেতো গেল বানিজ্যিক দিক । কিন্তু গুনগত মান ? এটা ঠিক, ইন্টারনেট বিশ্ব সঙ্গীতের দরজা খুলে দিয়েছে। ফুটবলে ইপিএল বা স্প্যানিশ লিগ দেখার পর কলকাতা ফুটবল লিগ যেমন ম্যাড়ম্যাড়ে লাগে, তেমনি বিশ্ব সঙ্গীতের সঙ্গে তাল রাখতে বাংলা গানেও তো উৎকর্ষতা বজায় রাখতে হবে। পরীক্ষা নিরীক্ষার পথ খুলতে হবে । এই বেনোজল থেকে দুধটুকু তুলে বের করার দায়িত্ব কিন্তু আমার আপনার সবার । মনোগ্রাহী গান ( হোক না তা কম সংখ্যায়) নাকি মধ্যমানের সঙ্গীত? এটা ঠিক করতে হবে কিন্তু আপনাকেই।

তথ্য সূত্র

http://timesofindia.indiatimes.com/city/kolkata/Sharadiya-songs-to-touch-a-milestone-this-Durga-Puja/articleshow/42475215.cms

http://www.thehindu.com/news/cities/kolkata/puja-music-albums-on-the-decline/article6463739.ece

http://www.maamatimanush.tv/articles.php?aid=829

বাংলা গানের সন্ধানে- সুধীর চক্রবর্তী

বাংলার গান, বাংলা গান – সম্পাদনা প্রবীর সেনগুপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here